ভ্রাম্যমান ভিক্ষুকের বিকাশ-নগদে প্রতারণার অর্থ! আড়ালে থাকতে চাইলেও শেষে সিআইডির হাতে গ্রেফতার প্রতারক দম্পতি
বাড়িতে ভ্রাম্যমাণ ভিক্ষুক এলে তাকে সরকারি রেশন ও অন্যান্য ভাতার প্রলোভন দেখিয়ে সংগ্রহ করা হতো ভিক্ষুকের নিজের নামে নিবন্ধিত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এর অ্যাকাউন্ট (বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদি) ও সিম কার্ড। তারপর সেই সিম কার্ড দিয়েই ফোন করা হতো পরিকল্পিতভাবে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা সম্ভব এমন ব্যক্তির কাছে। ভুক্তভোগীকে জানানো হতো তার মা, মেয়ে কিংবা স্ত্রী দুর্ঘটনার কবলে পড়ে আশংকাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি, তাৎক্ষণিক অর্থ পাঠানোর জন্য পূর্বে থেকেই সংগৃহীত ভিক্ষুকের এমএফএস অ্যাকাউন্ট নাম্বার দেওয়া হতো। কাঙ্ক্ষিত অর্থ পেয়ে গেলে সিম ও ব্যবহৃত মোবাইল নষ্ট করে ফেলা হতো। নিজেরা থেকে যেতো অধরা।
এমনই এক সুচতুর ও দুর্ধর্ষ প্রতারক দম্পতিকে গ্রেফতার করেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সিআইডি’র একটি চৌকস আভিযানিক দল। এলআইসি, সিআইডি শাখার এনালাইসিস ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় গত ২৩/০২/২০২৬ খ্রি. রাজশাহী মেট্রোপলিটনের পবা থানা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে স্বামী ও স্ত্রীকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিরা হল (০১) মোছা. সুলতানা খাতুন (৪৫), স্বামী- মো. মোবারক হোসেন; (০২) মো. মোবারক হোসেন (৫৫), পিতা- মৃত মহসিন, উভয় সাং- ছোট বোনগ্রাম, থানা- চন্দ্রিমা, জেলা- রাজশাহী। এ সময় তাদের নিকট হতে প্রতারণালব্ধ নগদ ২১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা, অপরাধ কার্যে ব্যবহৃত ৪টি মোবাইল ফোন সেট ও ৪টি সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায় বাদীর সুইডেন প্রবাসী বোন এর পরিচয় দিয়ে প্রতারক চক্র বাদীর মা’কে মোবাইলে কল দিয়ে জানায় যে সে সুইডেন থেকে দেশে এসেছে। দেশে এসে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে এবং তার কাছে টাকা পয়সা নেই। চিকিৎসার খরচের টাকার জন্য প্রতারক চক্র একটি রকেট অ্যাকাউন্ট প্রদান করে। বাদীর মা প্রতারকদের কথায় বিশ্বাস স্থাপন করে বিভিন্ন সময় ও তারিখে মোট ৪ লক্ষ ৮৫ হাজার ৯৬০ টাকা প্রেরণ করে। পরবর্তীতে ভুক্তভোগী প্রকৃত ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করে প্রতারণার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে ২৯/০৪/২০২৫ তারিখে গোমস্তাপুর থানায় জিডি নং-১৪৩৪ মূলে সাধারণ ডায়েরি করেন, যা পরবর্তীতে নিয়মিত মামলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তাপুর থানায় দায়েরকৃত মামলা নং-০৯, তারিখ ০৭/০৫/২০২৫, ধারা- ৪০৬/৪২০ পেনাল কোড এ রূপান্তর হয়।
মামলাটি তদন্তকালে জানা যায়, গ্রেফতারকৃত প্রতারক দম্পতি (০১) মোছা. সুলতানা খাতুন (৪৫) ও তার স্বামী (০২) মো. মোবারক হোসেন (৫৫) তাদের বাড়ীতে কোনো ভ্রাম্যমাণ ভিক্ষুক ভিক্ষা করতে আসলে তাদেরকে সরকারি রেশন, ভাতাসহ ও বিভিন্ন সরকারি সুযোগ সুবিধা পাইয়ে দেওয়া প্রলোভন দেয়, বিনিময়ে ভিক্ষুকদের নিজের নামে নিবন্ধিত সিম কার্ড ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এর অ্যাকাউন্ট (বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদি) প্রতারকদের কাছে জমা রাখতে হবে। প্রতারক দম্পতি সিমকার্ড হাতে পেয়ে সে সিমকার্ড ব্যবহার করে ভুক্তভোগী বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে ফোন করতো। ভুক্তভোগীকে জানানো হতো তাদের পরিবারের সদস্য বা নিকটাত্মীয় অসুস্থ কিংবা দুর্ঘটনার কবলে পড়ে আশংকাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি, মূমুর্ষু ব্যক্তির কাছে কোনো অর্থকড়ি নেই বলে সুচিকিৎসা হচ্ছে না। তাৎক্ষণিক অর্থ না পাঠালে প্রাণহানি হতে পারে। তখন গ্রেফতারকৃত মোবারক হোসেন পুরুষ কণ্ঠে এবং তার স্ত্রী মোছা. সুলতানা খাতুন নারী কণ্ঠে কথা বলতো। এরকম অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতিতে যাচাই বাছাই না করেই প্রতারকদের চাতুর্যপূর্ণ মিথ্যা সংবাদে ভীত ও আতঙ্কিত হয়ে অনেকে অর্থ পাঠাতে চাইলে প্রতারক চক্র পূর্বে থেকেই সংগৃহীত ভিক্ষুকের এমএফএস অ্যাকাউন্ট নাম্বার প্রদান করে। কাঙ্ক্ষিত অর্থ পেয়ে সিম ও ব্যবহৃত মোবাইল নষ্ট করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। আবার কখনো ভুক্তভোগীদের যদি কেউ সন্দেহ পোষণ করতো যে কণ্ঠ এমন কেন তাহলে বলতো ঠাণ্ডা-সর্দিতে কিংবা দুর্ঘটনার কারণে কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। কাঙ্ক্ষিত অর্থ পেয়ে গেলে অপরাধ কর্মে ব্যবহৃত সিম ও মোবাইল নষ্ট করে ফেলতো। আর প্রতারণা করেও নিজেরা থেকে যেতো অধরা।
এলআইসি, সিআইডি শাখা তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে প্রতারক চক্রের ব্যবহৃত মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর শনাক্ত করে প্রতারক দম্পতির অবস্থান নির্ণয় করে এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সিআইডি’র একটি চৌকস আভিযানিক দল রাজশাহী মেট্রোপলিটনের পবা থানা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে প্রতারনায় জড়িত স্বামী ও স্ত্রীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
গ্রেফতারকৃত প্রতারক দম্পতি (০১) মোছা. সুলতানা খাতুন (৪৫) ও তার স্বামী (০২) মো. মোবারক হোসেন (৫৫)দ্বয় প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অসংখ্য ভুক্তভোগীর সাথে এরকম প্রতারণার অপরাধ স্বীকার করে। মামলা সম্পর্কিত আরো তথ্য প্রাপ্তির লক্ষ্যে তাদেরকে পুলিশ রিমান্ডের আবেদনসহ প্রয়োজনীয় পুলিশ প্রহরায় বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করার প্রক্রিয়া চলমান।
বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম সিআইডির চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ইউনিট কর্তৃক চলমান রয়েছে এবং প্রতারণা চক্রের অন্যান্য সদস্যদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে।

