আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন যে সমীকরণ আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে, এর মূলেই রয়েছে জামায়াত-এনসিপি জোট। হঠাৎ গড়ে ওঠা এই বোঝাপড়া শুধু নির্বাচনের আগ মুহূর্তেই নয়, নির্বাচনোত্তর রাজনীতির সম্ভাব্য গতিপথ নিয়েও ‘হট টপিক’ হয়ে উঠেছে। তবে দলটির নেতারা মনে করেন, এবারের নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়াটা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য সংসদে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব জরুরি।
এদিকে, এই জোটকে ঘিরে অভ্যন্তরীণ ও বহুমাত্রিক চাপের মুখে পড়েছে এনসিপি, যার প্রতিফলন হিসেবে এরই মধ্যে দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের অন্তত ১৫ জন নেতা পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগী নেতাদের অভিযোগ, জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়ার মাধ্যমে এনসিপি তার ঘোষিত মূল লক্ষ্য ও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে এসেছে। অন্যদিকে, জোটে যুক্ত নেতারা বলছেন—এটি কোনো আদর্শিক ঐক্যের ফল নয়, বরং নির্বাচন সামনে রেখে একটি সীমিত ও কৌশলগত সমঝোতা। ভোটের মাঠে পারস্পরিক শক্তি ও সংগঠনকে কাজে লাগানোই এই বোঝাপড়ার মূল উদ্দেশ্য।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ধরনের জোটের ধারণা নতুন নয়। আদর্শিক মিল না থাকলেও জোট বা সমঝোতা হতে পারে। জামায়াত-এনসিপি জোটও এ ধরনের জোট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. স ম আলী রেজা কালবেলাকে বলেন, নির্বাচনী জোটের ধারণা আমাদের দেশে নতুন নয়। অতীতেও তা হয়েছে। এখানে আদর্শের জায়গাগুলো গৌণ। মূলত নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার কৌশল হিসেবে জোট করা হয়। বিশেষ করে ছোট দলগুলো সেই সুবিধাটা নেয়। আগে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী জোট হতো। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তারা দুই দল আলাদা জোট গঠন করছে।
একই কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম। কালবেলাকে তিনি বলেন, এই অঞ্চলে জোটের রাজনীতি জনপ্রিয়। এটি আদর্শিক এবং কৌশলী দুই ধরনের হতে পারে। এ ধরনের জোট আগেও হয়েছে। আদর্শিক মিল না থাকলেও নির্বাচনী জোট এবং জোটগত আন্দোলন হয়ে আসছে। উচ্চকক্ষের সুযোগ থাকায় জোটের রাজনীতি আরও বেড়ে যাবে বলে আমি মনে করি। কারণ জামায়াত ও এনসিপি দুই দলেরই ভোট বেড়ে যাবে। এতে উচ্চকক্ষে সিট বেশি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আদর্শের জায়গাটা নিজ জায়গায় রেখে এনসিপির জোটে যাওয়াটা ইতিবাচক। বিএনপির সঙ্গেও ইসলামী ঘরানাসহ বিভিন্ন মতাদর্শের জোট হয়েছে। রাজনীতিতে এগুলো খুবই স্বাভাবিক।
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী মোর্চায় এনসিপির যুক্ত হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে গত ২৮ ডিসেম্বর। ওইদিন এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বিষয়টি প্রকাশ্যে জানান। এর পরদিন পৃথক সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও জোটে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন এবং এটিকে নির্বাচনকেন্দ্রিক সমঝোতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
অন্তত ৩০টি আসন নিয়ে এই সমঝোতা হয়েছে বলে জানা গেছে। এরই মধ্যে এনসিপি নেতাদের জন্য কয়েকটি আসন থেকে নিজেদের প্রার্থী সরিয়ে নিয়েছে জামায়াত।
এনসিপির একাধিক নেতা কালবেলাকে বলেছেন, এবারের নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়াটা এনসিপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এরই মধ্যে জুলাই যোদ্ধা ও শক্তিদের মাইনাস করার জন্য মাঠে নেমেছে নানা পক্ষ। রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য সংসদে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব জরুরি। সেই জায়গা থেকেই সম্মিলিতভাবে জোটের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তারা আরও বলেন, বিএনপির সঙ্গে জোটের আলোচনা ছিল। জামায়াতের সঙ্গে মূলত বিচার, সংস্কারসহ মৌলিক ইস্যুতে ঐক্য হয়েছে। এখানে আদর্শগত কোনো বিষয় নেই। নির্বাচনের পর এই জোট থাকবে কি না, তা নিয়েও রয়েছে সংশয়।
এনসিপির নির্বাচনী মিডিয়া উপকমিটির প্রধান মাহাবুব আলম কালবেলাকে বলেন, ‘আগামীর সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণ, সংস্কার, সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে এবং সন্ত্রাস-চাঁদাবাজ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক বাক্সে ভোট হওয়া উচিত। এ জায়গা থেকে আমরা সম্মিলিতভাবে অধিকাংশ নেতার মতামতের ভিত্তিতে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটা আদর্শিক কোনো জোট নয়। আমরা আমাদের আদর্শের মধ্যেই আছি। জোটের অন্যান্য দলও নিজস্ব আদর্শ এবং মার্কার মধ্যেই থাকছে। এটা শুধু নির্বাচনী জোট।’
দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, ‘নির্বাচনকেন্দ্রিক সমঝোতা বাংলাদেশে নতুন ঘটনা নয়। অতীতে বিএনপি-জামায়াতের জোট, সমঝোতা সবই হয়েছে। তাতে করে একে অন্যের আদর্শ গ্রহণ করতে হয়নি। জামায়াত-এনসিপির জোটও আদর্শিক কোনো জোট নয়।’
গাজীপুর-২ আসনের এনসিপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট আলী নাছের খান বলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির এটি শুধু নির্বাচনী সমঝোতা। প্রত্যেকে প্রত্যেকের রাজনীতি করবেন। সব দলের রাজনৈতিক লাইন আলাদা, আমাদের বোঝাপড়া আলাদা। এটি ভোটের জন্য একটা কৌশল মাত্র।’
পদত্যাগকারীদের ফেরানোর চেষ্টা: জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী আসন সমঝোতায় যাওয়ার সিদ্ধান্তের পর এনসিপিতে একের পর এক পদত্যাগের ঘটনা ঘটছে। এ পর্যন্ত দলটি থেকে অন্তত ১৫ জন কেন্দ্রীয় নেতা পদত্যাগ করেছেন। দলছাড়া নেতাদের অভিযোগ, এনসিপি নতুন বন্দোবস্তের কথা বললেও বাস্তবে পুরোনো উপনিবেশিক ব্যবস্থার অংশীজনের সঙ্গে আপস করেছে। জোট করার মাধ্যমে দল মূল লক্ষ্য থেকে সরে গেছে। তবে কারও পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়নি। এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্ব আশা করছেন, পদত্যাগকারীরা দলে ফিরবেন।
জামায়াতের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ঘোষণার আলোচনার মধ্যে প্রথমেই পদত্যাগ করেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব, আলোচিত চিকিৎসক ও সমাজকর্মী ডা. তাসনিম জারা। তিনি দলটির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য ছিলেন। সমঝোতার আলোচনা চলার মধ্যে ২৫ ডিসেম্বর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সমর্থন জানিয়ে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন দলে জামায়াতবিরোধী অংশের নেতা হিসেবে পরিচিত মীর আরশাদুল হক। তিনি এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব ও চট্টগ্রাম মহানগরের প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন। পরে গত বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি।
পদত্যাগ করা অন্য নেতারা হলেন—এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ ও তাজনূভা জাবীন, মিডিয়া সেলের সম্পাদক মুশফিক উস সালেহীন, আইসিটি সেলের প্রধান ফরহাদ আলম ভূঁইয়া, যুগ্ম সদস্য সচিব আরিফ সোহেল, যুগ্ম সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন, উত্তরাঞ্চলের সংগঠক আজাদ খান ভাসানী (মওলানা ভাসানীর নাতি), দক্ষিণাঞ্চলের সংগঠক ওয়াহিদুজ্জামান, উত্তরাঞ্চলের সংগঠক দ্যুতি অরণ্য চৌধুরী, সদস্য সৈয়দা নীলিমা দোলা, আসিফ মোস্তফা জামাল, মীর হাবীব আল মানজুর, মারজুক আহমেদ ও আল আমিন টুটুল। এর বাইরে অন্তত পাঁচজন নেত্রী এ এনসিপি-জামায়াত জোট নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, যাদের মধ্যে দুজন এনসিপির মনোনীত প্রার্থী হয়েও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
জোটের আলোচনার শুরু থেকেই এর বিরুদ্ধে কথা বলেছেন সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। দল থেকে পদত্যাগ না করলেও তিনি নিষ্ক্রিয় রয়েছেন। এনসিপির কোনো কার্যক্রমে তাকে দেখা যাচ্ছে না। জোটের বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নির্ভরযোগ্য মিত্র না। তার রাজনৈতিক অবস্থান বা দর্শনসহ কোনো সহযোগিতা বা সমঝোতায় যাওয়া এনসিপিকে কঠিন মূল্য চুকাতে হবে বলে আমি মনে করি। জাতীয় নাগরিক পার্টির এত দিনের অবস্থান অনুযায়ী তার মূলনীতি, রাষ্ট্রকল্প জামায়াত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বিচার, সংস্কার ও গণপরিষদ নির্বাচন তথা সেকেন্ড রিপাবলিককে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দল এনসিপি। ফলে এই তিনটি বিষয়ে অভিন্ন অবস্থান যে কোনো রাজনৈতিক মিত্রতার পূর্বশর্ত।
পদত্যাগ করা আরেক নেতা সাবেক মিডিয়া সেল সম্পাদক মুশফিক উস সালেহীনের মতে, ওই জোটে যোগদান জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক রাষ্ট্র গঠনের রাজনৈতিক লক্ষ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তবে এনসিপির নেতারা বলছেন, অনেকেই বিষয়টি ভুল বুঝে দল থেকে পদত্যাগ করেছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। অনেকেই আবার দলে ফিরবেন বলে প্রত্যাশা তাদের। এ বিষয়ে যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, দলের অনেকের পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়নি। অনেকের সঙ্গেই কথা হচ্ছে। তারা তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে। দল তাদের বিষয়ে ইতিবাচক আছে।
এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সংগঠক মোহাম্মদ আতাউল্লাহ কালবেলাকে বলেন, এই জোট শুধু নির্বাচনী কৌশল। নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমরা আমাদের নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতিই করছি এবং করব। নির্বাচনের পরে এই জোট থাকবে কি না, সেটা সময় বলে দেবে। রাজনীতিতে নতুন হওয়ায় অনেকেই বিষয়টি না বুঝেই পদত্যাগ করতে পারেন। আমরা আশা করি, তারা এনসিপিতেই ফিরে আসবেন।
দলে ভাঙন ও নেতাদের পদত্যাগ প্রসঙ্গে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম শুরু থেকেই বলে আসছেন, দলের নির্বাহী পরিষদের সঙ্গে আলোচনা করে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে জোটের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। যে কোনো মতামতের ক্ষেত্রে কারও ভেটো (আপত্তি) থাকতে পারে, মতামত থাকতে পারে। তবে এনসিপির সারা দেশের নেতাকর্মী ও সহযোগী সংগঠনগুলো এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত।
সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, ‘যারা পদত্যাগ করেছেন, তাদের বিষয়টি আমাদের আহত করেছে। তারা পদত্যাগপত্র দিয়েছেন। কিন্তু আমরা তা এখনো অফিসিয়ালি গ্রহণ করিনি। তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।’


