কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার এক বৃদ্ধের অদ্ভুত প্রতিজ্ঞা ঘিরে এলাকায় তৈরি হয়েছে চাঞ্চল্য। বিএনপি ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত ভাত খাবেন না—এমন অটল সিদ্ধান্তে ছিলেন ৮০ বছর বয়সী ইনু মিয়া। দীর্ঘ ১৭ বছর পর সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটেছে। পহেলা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল) বিকেলে পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম নিজ হাতে তাকে ভাত তুলে দেন।
জানা যায়, কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর উপজেলার রামদী ইউনিয়নের পশ্চিম জগৎচর গ্রামের বাসিন্দা ইনু মিয়া ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন ভোট দিতে গিয়ে লাঞ্ছনার শিকার হন। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় তিনি ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। ওই ঘটনার পরই তিনি প্রতিজ্ঞা করেন—যতদিন না বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসবে, ততদিন তিনি ভাত খাবেন না।
এরপর থেকে টানা ১৭ বছর ভাত স্পর্শ করেননি তিনি। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজনের অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও তার এই সিদ্ধান্ত বদলানো সম্ভব হয়নি। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি কলা, রুটি, পুরি, বিস্কুট ও চা খেয়েই জীবনযাপন করেছেন।
পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম ইনু মিয়ার বাড়িতে যান। এ সময় ইনু মিয়া ফুলের তোড়া দিয়ে তাকে বরণ করে নেন। পরে প্রতিমন্ত্রী তাকে ফুলের মালা পরিয়ে শুভেচ্ছা জানান। এক পর্যায়ে তিনি নিজের হাতে প্লেটে ভাত তুলে ইনু মিয়াকে খাওয়ান। এ সময় উপস্থিত সবার মধ্যে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয় এবং হাসিমুখে ভাত খেয়ে নিজের দীর্ঘদিনের প্রতিজ্ঞার অবসান ঘটান ইনু মিয়া।
প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম বলেন, “দলকে ভালোবেসে এমন ত্যাগ স্বীকার করা সত্যিই বিরল। ইনু মিয়া তার অবস্থান থেকে প্রতীকী প্রতিবাদ করে গেছেন। আমরা দলীয় নেতাকর্মীরা তার পাশে থাকবো।” তিনি আরও জানান, অচিরেই ইনু মিয়ার জন্য একটি নতুন ঘর নির্মাণ এবং বয়স্ক ভাতার ব্যবস্থা করা হবে।
এ সময় প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট মশিউর রহমান, উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. কিতাব আলী, সাধারণ সম্পাদক এম.এ হান্নান, পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মো. শাহ আলম, কুলিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দিনসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
ইনু মিয়ার স্ত্রী জোছনা খাতুন বলেন, “অনেক চেষ্টা করেছি তাকে ভাত খাওয়ানোর জন্য, কিন্তু পারিনি। আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে নিয়েও খাওয়াতে পারিনি। তার একটাই কথা ছিল—বিএনপি ক্ষমতায় না এলে তিনি ভাত খাবেন না।”
জানা গেছে, ইনু মিয়া পেশায় একজন কৃষি শ্রমিক ছিলেন। কয়েক বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় তার বাম পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে। এরপর থেকে তিনি লাঠির সাহায্যে চলাফেরা করেন এবং আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না। বর্তমানে তিনি প্রায় কর্মহীন অবস্থায় শুয়ে-বসে কিংবা ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে জীবনযাপন করছেন।
তিন সন্তানের জনক ইনু মিয়ার বড় ছেলে ইকবাল হোসেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালান, ছোট ছেলে জাকির হোসেন জুতা তৈরির দোকানে কাজ করেন এবং মেয়ে মার্জিয়া খাতুনের বিয়ে হয়েছে। অভাব-অনটনের মধ্যেই দিন কাটছে তাদের পরিবারের।
দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রতিজ্ঞা ভেঙে অবশেষে ভাত খাওয়ার এই ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।

