কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীমকে হত্যার অভিযোগে থানায় হত্যা মামলা হয়েছে। গতকাল সোমবার (১৩ এপ্রিল) রাত ১০টার দিকে নিহতের বড় ভাই ফজলুর রহমান বাদী হয়ে দৌলতপুর থানায় এ হত্যা মামলা করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে বাকি দুই ভাইও ছিলেন। মামলায় ফিলিপনগর গ্রামের বাসিন্দা কাঠমিস্ত্রি রাজীব দফাদারকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে ১৮০ থেকে ২০০ জনকে।
গতকাল সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ভেড়ামারা সার্কেল) দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, আসামি ও জড়িত ব্যক্তিদের ধরতে পুলিশ অভিযান শুরু করেছে। মামলার এজাহারে ফজলুর রহমান উল্লেখ করেছেন, তাঁর ছোট ভাই মো. আবদুর রহমানের (৫৭) ফিলিপনগরে নিজ বাড়িতে দরবার শরিফ আছে। শনিবার বেলা পৌনে ৩টার দিকে তাঁর ভাই বাড়িতে অবস্থিত দরবারে অবস্থান করছিলেন। এ সময় রাজীবসহ অজ্ঞাতনামা ১৮০ থেকে ২০০ জন আসামি একযোগে সংঘবদ্ধ হয়ে হাতে লোহার রড, হাঁসুয়া, দা, ছুরি, কুড়াল, বাঁশের লাঠি ও কাঠের বাটাম নিয়ে দরবার শরিফে অনধিকার প্রবেশ করে।
দরবারের দরজা-জানালা ভাঙচুর করে। আসামি রাজীবসহ অজ্ঞাতনামা আসামিরা দরবার শরিফের দ্বিতীয় তলায় প্রবেশ করে জোবায়ের (৩১) নামের একজনকে লোহার রড দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করেন। এরপর আসামি রাজীব মিস্ত্রি লোহার রড দিয়ে আবদুর রহমানের কোমর বরাবর এবং হত্যার উদ্দেশ্যে মাথায় আঘাত করেন। অজ্ঞাতনামা আসামিরা আবদুর রহমানকে এলোপাতাড়িভাবে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে মাথার ওপর, ডান চোয়ালের কাছে, ঠোঁটের মধ্যে, থুতনিতে, পিঠের বাঁ পাশে ও ডান পায়ের হাঁটুর পেছনে কুপিয়ে গুরুতর রক্তাক্ত জখম করেন এবং বাঁশের লাঠি ও কাঠের বাটাম দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়িভাবে মারধর করেন।
আবদুর রহমানের চিৎকারে দরবার শরিফের পরিচারিকা জামিরন দৌড়ে যান। অজ্ঞাতনামা আসামিরা তাঁকেও হত্যার উদ্দেশ্যে মাথায় কোপ মারিতে গেলে কোপটি বাঁ হাত দিয়ে ঠেকালে বাঁ হাতের কবজির ওপরের অংশের মাংস কেটে রক্তাক্ত জখম হয়। এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, আসামিরা দরবার শরিফ ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে আনুমানিক ২০ লাখ টাকার ক্ষতি সাধন করে। অজ্ঞাতনামা আসামিরা আব্দুর রহমানের দরবার শরিফে থাকা স্টিলের আলমারি ভেঙে ১০ লাখ টাকা এবং ৪ ভরি স্বর্ণালংকার চুরি করে। পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীমের দরবারে হামলা, ভাঙচুর ও হত্যার ঘটনায় অংশ নেওয়া অন্তত ১৯ জনকে শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
তাঁদের মধ্যে অন্তত ১৩ জনের নাম-ঠিকানাসহ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টাও নিশ্চিত হয়েছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা। দরবারে হামলার ঘটনা নিয়ে জেলা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও কয়েকটি ফেসবুক আইডি দুই দিন ধরে বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হয়েছেন হামলায় আশপাশের কয়েকটি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা ছিলেন। হামলাকারীদের কেউ কেউ মুখ ঢেকে ছিলেন। তাঁদের নামও জানতে পেরেছেন। এ রকম ১৯ জন রয়েছে। তাঁদের সবার বাড়ি ফিলিপনগরসহ আশপাশের চরসাদীপুর ও ইসলামপুরে। ঘটনার পর অনেকেই এলাকা ছেড়ে গা-ঢাকা দিয়েছেন।
এ ঘটনায় গতকাল সোমবার (১৩ এপ্রিল) রাত ১০টার দিকে নিহত আবদুর রহমানের বড় ভাই অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক ফজলুর রহমান বাদী হয়ে দৌলতপুর থানায় একটি মামলা করেছেন। এতে অজ্ঞাতনামা ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। গতকাল সোমবার বিকেলে জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দুটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তাঁদের একজনকে প্রত্যক্ষদর্শীর মতে ঘটনাস্থলেও দেখা গেছে। পীরের ঘরের দরজা ভেঙে তাঁকে বের করে আঘাতকারী একজনকে শনাক্ত করা গেছে। তাঁর নাম রাজিব দফাদার। তিনি পেশায় কাঠমিস্ত্রি। বাবার নাম গাজী দফাদার।
রাজিব জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি করেন। ঘটনার দিন বিকেল পাঁচটার পর থেকে তিনি এলাকা ছাড়া। গতকাল সোমবার দুপুরে ফিলিপনগর গ্রামে দারোগার মোড় বাজারে রাজিবের কাঠের দোকানে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। সেখানকার একটি চায়ের দোকানিকে পীরকে টেনে বের করা এবং মারার ভিডিও দেখালে তিনি বলেন, ‘এটা রাজিব। শনিবার বিকেল পাঁচটার পর দোকানে এসে সে চলে গেছে। আর আসেনি। এই দোকানের কয়েকটি দোকানের পরই রাজিবের বাড়ি। বাড়িতে গিয়ে রাজিবের বাবাকে পাওয়া যায়নি। তবে সেখানে হাজির হন রাজিবের বোনের স্বামী জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, রাজিবের কাঠের দোকান তিনিই দেখছেন।
শনিবারের পর থেকে রাজিব কোথায় আছেন, জানেন না। রাজিব গত সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের প্রচার-প্রচারণাও করেছে। এলাকার জামায়াতের নেতা খাজা আহম্মেদের সঙ্গে থাকে। এ ব্যাপারে জানতে ফিলিপনগর গ্রামের বাসিন্দা ও দৌলতপুর উপজেলা জামায়াতের কর্মপরিষদের সদস্য (জেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি) খাজা আহম্মেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। দৌলতপুর উপজেলা জামায়াতের আমির বেলাল উদ্দিনকে ফোন দিলে তিনি একটি অনুষ্ঠানে আছেন জানিয়ে বলেন, পরে কথা বলবেন।
যোগাযোগ করা হলে জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি সুজা উদ্দীন জোয়ার্দ্দার বলেন, ‘যতটুকু শুনেছি দরবারে এলাকার মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে হামলা করেছে। তারা এলাকার সব রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে পারে। জামায়াতের কেউ আছে কিনা জানা নেই।’ পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রথম দফায় যারা হামলায় অংশ নেয়, তাদের বেশির ভাগই চলে যায়। প্রথম দফায় হামলাকারীদের মধ্যে ৫ থেকে ৭ জনের একটি দল সরাসরি একটি ভবনের দোতলায় উঠে পীরের কক্ষের সামনে যায়। পীরের দরজা ভাঙে রাজিব দফাদার। এরপর পীরকে টেনে বের করে হাতে থাকা শক্ত কিছু দিয়ে আঘাত করে।
তখন কয়েকজন কক্ষে প্রবেশ করে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে থেকে পাওয়া তথ্যে পুলিশ জানতে পেরেছে, মিছিল নিয়ে দরবারে গিয়েছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের দৌলতপুর উপজেলা শাখার সভাপতি আসাদুল ইসলাম। তাঁর বাড়ি ফিলিপনগর গ্রামে। যোগাযোগ করা হলে গতকাল সোমবার রাত সোয়া সাতটার দিকে আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘মিছিলের নেতৃত্ব দেওয়া বা ওই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন কোনো প্রমাণ কেউ দেখাতে পারবে না।’ ঘটনার আগে পুলিশের এক কর্মকর্তা তাঁর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেছিলেন স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘ওই পুলিশ কর্মকর্তা জানতে চেয়েছিলেন কোনো হামলার ঘটনার আশঙ্কা আছে কি না।
বলেছিলাম আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। গ্রামের ওলামাদের নিয়ে বিকেলে আসরের পর বৈঠক হবে সেটা বলেছিলাম। কিন্তু দুপুরের দিকে দরবারে কারা গেছে তা জানি না।’ এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়ে শনিবার দুপুরে জামায়াতে ইসলামীর নেতা খাজা আহম্মেদের সঙ্গে কথা হয়েছিল বলে জানান আসাদুল ইসলাম। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিকেল তিনটার দিকে সেখানে (দরবারে) দেখতে গিয়েছিলাম। কী হয়েছে, সেটা দেখার জন্য।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীম পবিত্র কোরআন সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন কয়েক বছর আগের ৩০ সেকেন্ডের এমন একটি ভিডিও গত শুক্রবার সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত শনিবার সকালে শামীমের দরবার থেকে আধা কিলোমিটার দূরে আবেদের ঘাট এলাকায় শতাধিক মানুষ জড়ো হয়। এরপর দুপুরের পর তারা ওই দরবারে হামলা চালায় এবং পুলিশের উপস্থিতিতেই শামীমকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে।
এখন পর্যন্ত কোনো আটক নেই উল্লেখ করে কুষ্টিয়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ভেরামারা সার্কেল) দেলোয়ার হোসেন বলেন, মামলা হলে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অভিযান আরও জোরদার করবেন। সোমবার বেলা আড়াইটার দিকে নিহত পীর আবদুর রহমানের দরবার শরিফে গিয়ে দেখা যায়, বাঁশবাগানে ঘেরা দরবার শরিফে সুনসান নীরবতা। দরবারের সঙ্গে বাঁশবাগানে অন্তত ১৫ জন পুলিশ সদস্যকে বসে থাকতে দেখা গেছে।
পালাক্রমে রাতদিন সেখানে রয়েছেন বলে পুলিশের এক সদস্য জানান। দরবারের ভেতর কোনো ভক্ত ও লোকজনকে পাওয়া যায়নি। ভাঙচুর হওয়া সবকিছু এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। দুপুরেও একটি আধা পাকা ঘরে আগুনে পোড়ার কুণ্ডলী থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা গেছে। গ্রামের মানুষেরা শনিবার ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

