হাতিয়ায় ছয় খুনের মামলায় এজাহার জালিয়াতির অভিযোগ: বাদীকে আটকে রেখে সই আদায়ের দাবি
নিজস্ব প্রতিনিধি:
নোয়াখালীর হাতিয়ায় সংঘটিত ছয় জনের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দায়ের করা দুটি হত্যা মামলায় চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে।
মামলার বাদীদের দাবি, হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম তাদের থানায় জোর করে আটক রেখে হত্যার ভয় দেখিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের নাম বাদ দিয়ে নিরপরাধ ব্যক্তিদের আসামি করে এজাহারে সই করিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে মামলা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যেই মনগড়াভাবে আসামির তালিকা তৈরি করা হয়েছে।
এই অভিযোগ এনে পৃথক দুটি হত্যা মামলার বাদী জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
জানা যায়, গত ২৩ ডিসেম্বর হাতিয়া উপজেলার সুখচর ইউনিয়নের জাগলার চরে চরের ভূমি দখল ও আধিপত্যকে কেন্দ্র করে আলাউদ্দিন বাহিনী, কোপা শামছু বাহিনী ও ফরিদ কমান্ডার বাহিনীর মধ্যে দিনভর ত্রিমুখী সংঘর্ষ ও গোলাগুলি চলে। একপর্যায়ে ফরিদ কমান্ডার বাহিনীর সদস্যরা পালিয়ে গেলেও সংঘর্ষে আলাউদ্দিন বাহিনীর প্রধান আলাউদ্দিন, কোপা শামছু বাহিনীর প্রধান কোপা শামছু, তার ছেলে মোবারক হোসেন শিহাবসহ মোট ছয় জন নিহত হন।
এই ঘটনায় ২৫ ডিসেম্বর নিহত কোপা শামছুর ভাই আবুল বাসার বাদী হয়ে ৩০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ১০–১২ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে হাতিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। একই ঘটনায় পরদিন ২৬ ডিসেম্বর নিহত আলাউদ্দিনের বাবা মহি উদ্দিন ২১ জনের নাম উল্লেখ ও ৪০–৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে আরেকটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
তবে মামলা দায়েরের সময় উভয় মামলার এজাহারেই জোরপূর্বক আসামির তালিকা পরিবর্তন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বাদী আবুল বাসার ও মহি উদ্দিন।
নিহত আলাউদ্দিনের বাবা মহি উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, ২৬ ডিসেম্বর দুপুরে থানায় মামলা করতে গেলে স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা তাকে জোর করে থানার ভেতরে ওসির কক্ষের পাশের একটি কক্ষে আটকে রাখেন। পরে পুলিশ পক্ষ থেকে একটি লিখিত এজাহারে সই করতে বলা হলেও তিনি তা করতে অস্বীকৃতি জানান।
এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তালাবদ্ধ কক্ষে আটকে রাখা হয় এবং সই না করলে তাকেও হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে প্রাণভয়ে বাধ্য হয়ে তিনি এজাহারে সই করেন বলে জানান।
তিনি আরও দাবি করেন, এজাহারে যেসব ব্যক্তির নাম রয়েছে, তাদের অনেকেই এই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। মহি উদ্দিন বলেন,
‘এজাহারে ওসি তার ইচ্ছেমতো নাম বসাইছেন। অনেক আসামির নাম আমি নিজেও আগে কখনো শুনিনি।’
অপর মামলার বাদী নিহত কোপা শামছুর ভাই আবুল বাসার বলেন,
‘আমি যাদের নাম এজাহারে দিয়েছিলাম, থানার লোকজন সেগুলো বাদ দিয়ে নতুন করে এজাহার লিখে আমার কাছ থেকে জোর করে সই নেয়। বর্তমান এজাহারে থাকা অনেক আসামিকে আমি নিজেও চিনি না। ভাই হারিয়ে আমরা ন্যায়বিচার চাই। কিন্তু প্রকৃত খুনিদের বাদ দিয়ে নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করা হলে সেটা আমরা মেনে নেবো না।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাতিয়া থানার ওসি সাইফুল ইসলাম সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘জাগলার চরের ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। মামলার বাদীরা এখন আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করছেন, সেগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। তারা স্বাধীনভাবে নিজেদের ইচ্ছেমতো এজাহার দিয়েছেন। এখন কেন তারা এসব বলছেন, আমি জানি না।’
বাদীদের থানায় আটক রেখে হত্যার ভয় দেখিয়ে এজাহারে সই করানোর অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,
‘থানার পক্ষ থেকে তাদের ওপর কোনো চাপ প্রয়োগ করা হয়নি। আমরা শুধু বলেছি, তারা যেন নিরপেক্ষভাবে নিজেরা এজাহার দেন। থানার বাইরে কী হয়েছে, তা আমার জানা নেই।
’
এ বিষয়ে নোয়াখালীর পুলিশ সুপার টি এম মোশাররফ হোসেন বলেন,
‘বিষয়টি নিয়ে একটি মৌখিক অভিযোগ শুনেছি। পাশাপাশি জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগের অনুলিপিও পেয়েছি। আমরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখছি।’


