প্রকাশঃ রবিবার,১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬॥ ০২ ফাল্গুন ১৪৩২। ২৬ শাবান ১৪৪৭
দখলচাঁদাবাজিসহ নেতাকর্মীদের বিতর্কিত কর্মকান্ডের প্রভাব পড়েছে ভোটের ফলাফলে
কুষ্টিয়া প্রতিনিধিঃ দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলে এবারের নির্বাচনে ঘটেছে নাটকীয় পরিবর্তন। কুষ্টিয়ামেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা জেলার আটটি সংসদীয় আসনের মধ্যে সাতটিতেই জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা। মাত্র একটি আসনে জয় পেয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ফলে 'বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে এখন জামায়াতের জয়জয়কার। ঘাঁটিতে এমন ভরাডুবিতে হতাশ দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। রাজনৈতিক মহল ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে পরাজয়ের পেছনে একটি প্রধান কারণ ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানের পর দলের নেতাদের ব্যাপকহারে দখল ও চাঁদাবাজিসহ নানা বিতর্কিত কর্মকান্ড। সূত্র বলছে, ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ব্যাপক দখল ও চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়ে নেতাকর্মীরা। তিন জেলায় দলের জেলা পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক ব্যবসা ও স্বর্ণ চোরাচালানসহ নানা অভিযোগ উঠে। বিশেষ করে চুয়াডাঙ্গা সদর আসনের বিএনপি প্রার্থী শরিফুজ্জামান শরিফ নিজেই চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণসহ নানা বিতর্কিত কাজের অভিযোগ উঠে। তাঁর নেতাকর্মীরা সারা জেলায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। শরিফ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় পুরো জেলাজুড়ে ছিল তাঁর নিজস্ব বাহিনী। ওই বাহিনীর সদস্যরা চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক ব্যবসা ও স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িয়ে পড়ে। শুধু তার উপজেলায় নয়, পার্শ্ববর্তী দামুড়হুদা ও জীবননগর উপজেলায়ও তার লোকজনের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে উঠে সাধারণ মানুষ। এতে বিএনপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় ভোটাররা। যার কারণে ক্লিন ইমেজের নেতা হয়েও শরিফের বিতর্কিত কর্মকান্ডের কারণে চুয়াডাঙ্গা২ আসনে মাহামুদ হাসান খান বাবুকে পরাজিত হতে হয়েছে। নেতাকর্মীদের দাবি, দলের হাইকমান্ডের ভুল সিদ্ধান্তে কারণে চুয়াডাঙ্গার দুইটি আসনই হাতছাড়া হয়েছে বিএনপির। দলের নেতাকর্মরা বলছেন শরিফুজ্জামান শরিফের অপকর্মের কারণে দুইটি আসনেই দলীয় প্রার্থীর ভরাডুবি হয়েছে। কুষ্টিয়ার তিনটি আসনেই দলের প্রার্থীর ভরাডুবির প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি ও দখলবাজিসহ নানা বিতর্কিত কর্মকান্ড। বিষয়টি নিয়ে সচেতন মহল একাধিকবার সতর্ক করলেও কোন কর্ণপাত করেননি জেলার শীর্ষ নেতারা। কুষ্টিয়া জেলাজুলে নানা বিতর্কিত কর্মকান্ডে আলোচনার শীর্ষে ছিল ৫ থেকে ৭ জনের নাম। কিন্তু শুরু থেকেই এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে নেতারা। অভিযোগকে গুজব বলে উল্টো তাদের পক্ষেই সাফাই গেয়েছেন নেতারা। যার ফল নির্বাচনে হারে হারে বুঝেছেন নেতারা। কুষ্টিয়ার খোকসায় রাজন, সদর উপজেলায় যুবদল নেতা আব্দুল মাজেদ ছিলেন বিতর্কেকের শীর্ষে। এছাড়া শহরের প্রায় এক ডজন নেতার চাঁদাবাজি ও দখলবাজি শহরজুড়ে ছিল আলোচনায়। এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে নেতাকর্মীদের বিতর্কিত কর্মকান্ড। আলোচিত এই বিষয়টি কুষ্টিয়ার তিনটি আসনে পরাজয়ের একটি কারণ বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা। যার কারণে সাধারণ মানুষ বিএনপির থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। নির্বাচনের সময় সেই ক্ষোভ ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশিৱষ্টরা। কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব খন্দকার তসলিম উদ্দিন নিশাত বলেন, কতিপয়,বৃহত্তর কুষ্টিয়ায় ৮ আসনে বিএনপির'র ভরাডুবির নেপথ্যে২
নেতার বিতর্কিত কর্মকান্ডের প্রভাব পড়েছে ভোটের ফলাফলে। তিনি বলেন, নজিরবিহীন চাঁদাবাজি এবং দখলবাজির কারণেই বিএনপি প্রার্থীদের ভরাডুবি হয়েছে। একই অবস্থা মেহেরপুর জেলায়ও। ৫ আগস্টের পর মেহেপুরের তিনটি উপজেলার দুইটি আসনের নেতাকর্মীরা নানা বিতর্কিত কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন। 'নেতাকর্মীদের দখল ও চাঁদাবাজিতে অতিষ্ট হয়ে উঠে সাধারণ ভোটাররা। এমনকি সদর আসনের প্রার্থী মাসুদ অরুণসহ তার লোকজনের বিতর্কিত কর্মকান্ডে ইমেজ সংকটে পড়তে হয় বিএনপিকে। অভিযোগ রয়েছে, মাসুদ অরুণ নিজেই চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়েন। দলের নেতাকর্মীরা বলেন, ৫ আগস্টের মাসুদ অরুণ শহরে ৭তলা বাড়ি করেছেন। ১৭ বছর পর এসব টাকা কোথা থেকে আসলো। একদিকে যেমন মনোনয়ন দেয়ায় ভুল সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে বড় নেতা থেকে শুরু করে ছোট নেতাদের বিতর্কিত কর্মকান্ডে মেহেরপুরের দুইটি আসনই বিএনপির হাতছাড়া হয়েছে বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা। মেহেরপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসান বলেন, দলের কিছু নেতাকর্মীর চাঁদাবাজিদখলবাজি সাধারণ মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। এসব কারণে প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন বলে মনে করেন এই নেতা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলের আটটি আসনের মধ্যে কুষ্টিয়া১ (দৌলতপুর) আসনে একমাত্র বিএনপি প্রার্থী হিসেবে রেজা আহম্মেদ বাচ্চু মোলরা ১ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের বেলাল উদ্দীন পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৮৫ ভোট। কুষ্টিয়া২ (মিরপুরভেড়ামারা) আসনে জামায়াত প্রার্থী আব্দুল গফুর ১ লাখ ৯২ হাজার ৮৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির রাগিব রউফ চৌধুরী পেয়েছেন ১ লাখ ৪৩ হাজার ৮২১ ভোট। কুষ্টিয়া৩ (সদর) আসনে জামায়াত প্রার্থী মুফতি আমির হামজা ১ লাখ ৮২ হাজার ৪৭৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির জাকির হোসেন সরকার পেয়েছেন ১ লাখ ২৭ হাজার ৫৫৯ ভোট। কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালীখোকসা) আসনে জামায়াত প্রার্থী আফজাল হোসেন ১ লাখ ৪৮ হাজার ২০১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সৈয়দ মেহেদী আহম্মেদ রুমী পেয়েছেন ১ লাখ ৩৯ হাজার ৬০৩ ভোট। চুয়াডাঙ্গা১ (সদরআলমডাঙ্গা) আসনে জামায়াত প্রার্থী মাসুদ পারভেজ ২ লাখ ১১ হাজার ৪১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির শরিফুজ্জামান শরিফ পেয়েছেন ১ লাখ ৫৩ হাজার ১৯৩ ভোট। চুয়াডাঙ্গা২ (দামুরহুদাজীবননগর) আসনে জামায়াত প্রার্থী রুহুল আমিন ২ লাখ ৮ হাজার ১১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মাহামুদ হাসান বাবু পেয়েছেন ১ লাখ ৬৩ হাজার ৮৭৭ ভোট। মেহেরপুর১ (সদরমুজিবনগর) আসনে জামায়াত প্রার্থী তাজউদ্দীন খান ১ লাখ ২২ হাজার ৮২৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মাসুদ অরুণ পেয়েছেন ১ লাখ ৪ হাজার ২২৪ ভোট। মেহেরপুর-২(গাংনী) আসনে জামায়াত প্রার্থী নাজমুল হুদা ৯৪ হাজার ১৬৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির আমজাদ হোসেন পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৬৮৯ ভোট।