বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রতিযোগিতামূলক-বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ হিসেবে মূল্যায়ন দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন। একইসঙ্গে নারীদের সীমিত অংশগ্রহণ, ডিজিটাল ও রাজনৈতিক পরিসরে নারীবিরোধী হয়রানি এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইইউ পর্যবেক্ষকরা। অন্যদিকে কমনওয়েলথ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন ‘বাংলাদেশের জনগণ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছে এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।’শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীতে আয়োজিত পৃথক সংবাদ সম্মেলনে দুই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দলের প্রধানরা তাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। ইইউ মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ইভারস ইজাবস বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক হয়েছে। গ্রহণযোগ্যতা ও আইনের শাসনের কাঠামোর মধ্যেই ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে।ইইউ পর্যবেক্ষকরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৮০৫টি ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করেছেন বলে জানান ইভারস আইজাবস। তার ভাষ্য, ভোটের দিন অধিকাংশ কেন্দ্রে পরিবেশ ছিল শান্ত এবং ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও লজিস্টিক ব্যবস্থাপনাকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে মিশনটি। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, নির্বাচনি প্রচার ও অনলাইন পরিসরে নারীদের বিরুদ্ধে অবমাননাকর বক্তব্য, চরিত্রহনন ও যৌন হয়রানিমূলক আক্রমণের ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে। “ডিজিটাল পুরুষতান্ত্রিক হয়রানি, গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থি। যারা এমন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের পরিবারের প্রতি আমরা সমবেদনা জানাই।” বলেন আই জাবস। নারী প্রার্থী মাত্র চার শতাংশ॥ ইইউ মিশনের প্রতিবেদনে সবচেয়ে জোরালোভাবে উঠে এসেছে নারীদের সীমিত অংশগ্রহণের বিষয়টি। মোট প্রার্থীর মাত্র চার শতাংশ নারী-এ তথ্যকে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ঘাটতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। ইজাবস বলেন,‘নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে যে অঙ্গীকারের কথা বলা হয়, বাস্তব প্রার্থী মনোনয়নে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।’ পর্যবেক্ষকদের মতে, শুধু প্রার্থী সংখ্যা নয়— প্রচারণা, দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং নির্বাচনি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরেও নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রয়োজন। তারা রাজনৈতিক দলগুলোকে অন্তর্ভুক্তিমূলক মনোনয়ন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটাধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে আরও আন্তরিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে ইইউ। নির্বাচন-সংক্রান্ত বিচ্ছিন্ন সংঘাতের ঘটনা উল্লেখ করে মিশন বলেছে, সামগ্রিক পরিবেশ শান্তিপূর্ণ হলেও সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। ইইউ প্রতিনিধি দলের প্রধান টমাস জেডে চোভস্কি বলেন,‘কিছু সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে, তবে সার্বিকভাবে নির্বাচনের পরিবেশ শান্ত ছিল। আমরা নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিও পর্যবেক্ষণ করছি।’ তিনি জানান, দুই মাসের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে, যেখানে ভবিষ্যতের করণীয় নিয়ে বিস্তারিত সুপারিশ থাকবে। ফল মেনে নেওয়ার সংস্কৃতির প্রশংসা॥ নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর রাজনৈতিক দলগুলো শান্তিপূর্ণভাবে জয়-পরাজয় মেনে নেওয়াকে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন ইইউ পর্যবেক্ষকরা। তাদের মতে, গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতার জন্য এই সংস্কৃতি গুরুত্বপূর্ণ। এক প্রশ্নের জবাবে, একটি বড়ো রাজনৈতিক দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা নিয়ে মন্তব্য করতে অনীহা প্রকাশ করেন জেডেচোভস্কি। তিনি বলেন,‘আমরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে এসেছি— এটাই আমাদের মূল এজেন্ডা।’ অর্থাৎ অংশগ্রহণমূলকতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কে না গিয়ে প্রক্রিয়াগত দিকেই নজর রাখার কথা জানান তিনি।কমনওয়েলথের মূল্যায়ন জনগণ গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ॥ পৃথক সংবাদ সম্মেলনে কমনওয়েলথ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ও ঘানার সাবেক প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম নানা আকুফো আদৌ বলেন,‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছে।’ তিনি নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে উত্তেজনার বিচ্ছিন্ন ঘটনা লক্ষ্য করার কথা জানিয়ে সব রাজনৈতিক পক্ষকে শান্ত ও সংযত থাকার আহ্বান জানান। “যে-কোনো বিরোধ প্রাসঙ্গিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা উচিত।’ বলেন, তিনি। কমনওয়েলথ মিশন নির্বাচন কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের ভূমিকার প্রশংসা করে জানায়, নির্বাচন ও সংশ্লিষ্ট গণভোট সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ভবিষ্যৎ নির্বাচনি চক্রের দিকে তাকিয়ে নির্বাচন-পরবর্তী পর্যালোচনা (পোস্ট-ইলেকশন রিভিউ) পরিচালনার পরামর্শও দেয় তারা, যাতে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় পর্যবেক্ষকদের সুপারিশগুলো অন্তর্ভুক্ত করা যায়। গণতন্ত্রের নতুন ধাপ! ইইউ মিশন তাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছে, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নাগরিকের ভোটাধিকার চর্চায় বাংলাদেশ একটি নতুন ধাপে প্রবেশ করেছে। তবে তারা স্পষ্ট করে বলেছে— গণতন্ত্র শুধু ভোটের দিনেই সীমাবদ্ধ নয়; রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ এবং সংখ্যালঘু সুরক্ষা— সব মিলিয়েই একটি পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে ওঠে। নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোকে তারা ভবিষ্যতের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে। দলীয় মনোনয়ন নীতিতে কোটাভিত্তিক ব্যবস্থা, নারীবান্ধব প্রচারণা পরিবেশ এবং অনলাইন হয়রানি রোধে কঠোর আইন প্রয়োগের মতো পদক্ষেপের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ইইউ নির্বাচন প্রধান এক বাংলাদেশের মিডিয়াগুলোর অবস্থান সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতা কেমন জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো (প্্িরন্ট ও ইলেকট্রনিক) এবং সোস্যাল মিডিয়া সঠিক তথ্য প্রকাশ করতে কার্পন্য করে। এসব মিডিয়ার বেশিরভাগই সত্য প্রকাশ না করে রাজনৈতিক দলের পারপারস সার্ভ করতে ব্যস্ত থাকে। ইইউ জানিয়েছে, তাদের দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষকদের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দুই মাসের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। সেখানে আইনি কাঠামো, প্রচারণা পরিবেশ, গণমাধ্যমের ভূমিকা, নির্বাচনি প্রশাসন এবং ভোটার অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন সূচকে বিশদ মূল্যায়ন থাকবে। কমনওয়েলথও তাদের সুপারিশ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করবে বলে জানিয়েছে। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক দুই পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রাথমিক মূল্যায়নে নির্বাচনের প্রতিযোগিতামূলক ও শান্তিপূর্ণ চিত্র উঠে এলেও নারীর সীমিত অংশগ্রহণ, ডিজিটাল সহিংসতা এবং সংখ্যালঘু নিরাপত্তা প্রশ্নে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে-গণতন্ত্রের মানোন্নয়নে এখনই কাঠামোগত সংস্কার ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।